এ পরিস্থিতিতে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে। এ সুযোগে ইরান ও রাশিয়ার অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানিতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ইউরোপভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত মার্চে এ দুই দেশের জ্বালানি তেল রফতানি আগের ১২ মাসের গড়ের তুলনায় ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মার্চে ইরানের দৈনিক জ্বালানি তেল রফতানি ১৮ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৭ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে রাশিয়ার জ্বালানি তেল রফতানি ৬ শতাংশ বেড়ে দৈনিক ৫৩ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় সৌদি আরব ও কুয়েতের মতো প্রথাগত উৎস থেকে সরবরাহ কমেছে, ফলে রাশিয়া ও ইরান এশীয় বাজারের বড় হিস্যা দখল করে নিচ্ছে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মার্চে জ্বালানি তেল পরিবহন প্রায় ৮৬ শতাংশ কমে গেছে। সৌদি আরবের জ্বালানি তেল রফতানি গত মার্চে ৩১ শতাংশ কমে দৈনিক ৪৩ লাখ ২০ হাজার ব্যারেলে নেমেছে। দেশটি বিকল্প হিসেবে পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগর হয়ে তেল পাঠানোর চেষ্টা করলেও বৈশ্বিক ঘাটতি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) সতর্ক করেছে, এ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এটি বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ১০ শতাংশ।
সংকটময় এ সময়ে এশিয়ার দেশগুলোর কাছে অন্যতম প্রধান জ্বালানি তেলের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া। মার্চে রাশিয়ার তেল রফতানি ৬ শতাংশ বেড়ে দৈনিক ৫৩ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। লোহিত সাগরে অস্থিরতার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ অনিশ্চিত হওয়ায় ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন রুশ জ্বালানি তেলের দিকে ঝুঁকছে। এমনকি দক্ষিণ কোরিয়াও ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো রুশ জ্বালানি তেল আমদানির কথা বিবেচনা করছে। ইন্দোনেশিয়াও সম্প্রতি রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রে এ চিত্র আরো স্পষ্ট। ২০১৯ সাল থেকে বন্ধ রাখার পর দেশটি পুনরায় গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান থেকে তেল আমদানি শুরু করেছে। মার্চে ভারত ইরান থেকে দৈনিক ১ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল জ্বালানি তেল আমদানি করেছে, যা গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৮০ শতাংশ বেশি। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত সরবরাহকারীরা সময়মতো তেল দিতে না পারায় ভারত তাদের আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনছে।
চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রুশ জ্বালানি তেলের দামও রেকর্ড ছাড়িয়েছে। বর্তমানে রাশিয়ার ‘উরালস’ তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ৯৮ ডলারে ঠেকেছে, যা গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি। বর্তমানে রুশ জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড ও মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুডের চেয়েও বেশি। অথচ এর আগে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ তেল অনেক সস্তায় পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক সংকট সে সমীকরণ বদলে দিয়েছে। একসময়কার সস্তা তেল এখন প্রিমিয়াম দামে কিনে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে এশীয় দেশগুলোকে। এ ডামাডোলে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ইরান ও রাশিয়ার তেলের বাজার আরো শক্তিশালী হচ্ছে।